Connect with us

গল্প

টক ঝাল মিষ্টিতে ভরা সেই ছোট্টবেলা

Published

on

গদ্য_গুচ্ছের প্রথম দিনে আমি আবার ছোটবেলার কিছু গল্প নিয়ে এসেছি । হঠাৎ করে আমাকে আমন্ত্রণ জানান #শর্মিষ্ঠা_দাস_দেব_পুরকায়স্থ পেশায় শিক্ষিকা ডলু নিবাসী, আমার পরম আত্মীয় ।
আর এই গল্পগুচ্ছে আমাকে অনুপ্রেরণা যুগান দিদি #মৌমিতা_বিশ্বাস,বললেন লিখে যা পারবি আর আমিও শুরু করে দিলাম ।
***কারুর ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই নিজের জীবন থেকে গল্প কুড়িয়ে নিয়ে লিখতে পারেন

টক ঝাল মিষ্টিতে ভরা সেই ছোট্টবেলা

গ্রামের বাড়িতেই ছিল বাল্যকাল । কি সুন্দর ঝরনা নদী-নালা ছিল । অনেক ধরনের পাখিদের সাথে ওদের মতো করে ডেকে ডেকে দিন কেটে যেত । যত বেশি ডাকতাম(পাখিদের আওয়াজ) আরো বেড়ে যেত,তীব্রভাবে পাখিদের ডাক শুরু হয়ে যেত, হয়তো ওদের মতো করে ডাকতাম বলে, তখন তো আর বুঝতাম না, শুধু আনন্দ উপভোগ করতাম । এখন অনুভব করি, খুব কষ্ট পেত, ক্ষেপে যেত ওরা। জানলে কি আর ডাকতাম ওদের মতো করে ? নিশ্চয়ই কষ্ট দিতাম না ওদেরকে ।

নদীতে পুকুরে কত সাঁতার কাটা বাড়ির কেউ লাঠি (বেত)নিয়ে গেলে তবেই ভয়ে উঠতাম জল থেকে ।সকাল আটটা হলেই শুরু হয়ে যেত সাঁতার প্রতিযোগিতা।সেই যে আমাদের সরকারি পুকুরটা ছিল, সব বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শুরু হয়ে যেত সাঁতার কাটা। সাড়ে নয়টায় যেকোনো ভাবে স্কুলে রওয়ানা হতে হতো, কিন্তু সময়ের কোনো খেয়াল নেই তখন ।লাঠি নিয়ে কেউ গেলে তবেই জল থেকে ওঠা । গ্রামের সবাই (ছাত্ররা) একসাথে দল বেঁধে স্কুলে আসা, আবার ছুটির পর একসাথেই সবার ঘরে ফিরে যাওয়া । একজন একটু পেছনে থাকলে,সাথের দশজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, যাতে কোন কাকিমনি,জ্যেঠিমনি জিজ্ঞেস না করেন, কিরে ও কোথায়, এল না দেখি ? সেই ভয়ে ।

বিকেল হয়ে যেত স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে । তবুও খেলার সময় ঠিকই থাকতো ।ঘরে ফিরেই খেয়ে খেলার মাঠে যাওয়া, আবার খেলার মাঠ থেকে বেত নিয়ে কেউ গেলে তবেই ঘরে ফেরা ।প্রতিদিন স্কুলে ওভাবেই যাওয়া আসা । মাঝেমধ্যে দেখতাম বন্ধু-বান্ধবীরা স্কুল ফাঁকি দেয়,পেটে ব্যথা,মাথায় ব্যথা, জ্বর এসেছে নানান কিছু বলে । একদিন আমারও খুব সাধ হল, আমিও একদিন স্কুল ফাঁকি দেব । কাউকে না পেয়ে এক বান্ধবী কে খুঁজে বার করলাম,যে প্রতি রোজ স্কুল ফাঁকি দেয় । হয়তো তার সাথে ফাঁকি দিলে ফাঁকি মজাদার হবে । নাম ছিল তার রায়না । তো একদিন আমিও সেভাবে স্কুলে গিয়ে স্কুল টা ঠিক ফাঁকি মারলাম । দুটো ক্লাস পরে দিদিমণি কি বললাম, ও দিদিমণি,আমার পেটে খুব ব্যথা করছে গো আমি ঘরে যাব দিদিমণি ।আমাকে অবিশ্বাস করবে,সেটা তো হতেই পারে না । উনিও বললেন পেটে ব্যথা যখন ঘরে চলে যাও ।আমি দিদিমণিকে বললাম,দিদিমণি আমি একা যেতে পারব না, রায়না কে দিয়ে দাও না ।আমার সাথে ব্যাস দিদিমণি ও রাজি । স্কুল থেকে বেরিয়ে বললাম কি মজা,স্কুল ফাঁকি দিতে পেরেছি। সবাই রোজ ফাঁকি দেয়, আমি একদিনও ফাঁকি দিলাম না । আজ আমার সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়ে গেল ।

কি করবো ঘরে তো স্কুল ফেরার সময় টা তেই ফিরতে হবে । কি করা যায়,অনেক দূর হেঁটে এসে নদীর পারে বসলাম । সেখানে বিশাল বড় একটা কামরাঙ্গা গাছ ছিল । সেখান থেকে কামরাঙ্গা পেরে রায়না আর আমি খুব কামরাঙ্গা খেলাম ।অনেকক্ষণ কেটে গেল এবার আস্তে-আস্তে আস্তে শুরু করলাম হাঁটা । নদীর পাড়ে হাটা, নদীতে নেমে জল নিয়ে খেলা।
ওমা ! কি করি এখন, কুকুর একটা পেছনে ছুটল, ভয়ে আর কিছু না বলে, আঙ্গুল একটু বেঁকিয়ে দিলাম, যা আমাদের ছোটবেলার বিশ্বাস ছিল,কুকুর ধাওয়া করলে আঙ্গুল বেঁকিয়ে রাখলে কুকুর ধরবেনা ।
সেই করতে করতে হঠাৎ দেখি পিছন দিয়ে অনেক ছাত্ররা আমাদের বন্ধুবান্ধবরা আসছে । এবার শান্তি পেলাম । যাক বাবা, স্কুলের সময়টা পার হয়ে গেল, এখন ঘরে ফিরবো শান্তিতে,ওদের সঙ্গ ধরে ঠিক ঘরে সময় মতো চলে এলাম ।
স্কুলের ড্রেস খুললাম, মা খাবার দিল খেয়েও নিলাম । খেয়ে আবার সেই খেলার মাঠে । সন্ধ্যেবেলা দাদা ঘরে এসে মা কে বলল, মনি কোথায় ? আমাকে আদর করে ঘরের সবাই মনি ডাকত । কেউ তো আর ঘরের কিছুই জানে না স্কুল ফাঁকি দিয়েছি বলে । কিন্তু দাদার কাছে খবর চলে এসেছিল সেই #রত্নাদিদিমণি, দাদাকে বলে দিলেন, এই শিল্পী তো আজ স্কুল থেকে অনেক আগে গেছে রে, ওর খুব পেটে ব্যথা, খেয়াল রাখিস তো ।ব্যাস স্কুল ফাঁকি দেওয়াটাও আচ্ছা করে বেরিয়ে গেল । কি বকাটা না খেয়ে ছিলাম সেদিন । দাদা লাঠি নিয়ে এসেছিল মারবে বলে কিন্তু আমি খাটের তলায় ঢুকে বসে ছিলাম । মারতে পারেনি ,কিন্তু সেখানে ঢুকে ব্যথা পেয়ে গেছিলাম ।চোখের সামনা ফুলে গেছিল।

স্কুলে যাওয়ার সময়,চোখের সামনা টা চুল দিয়ে ঢেকে কদিন গিয়েছিলাম কদিন। সবাই জিজ্ঞেস করত কিরে তুই চুল ওমন করে স্টাইল করছিস কেন ? আমি বলতাম ভালো লাগে বলে । কাউকে দেখাতাম না ,বললে তো ভীষণ লজ্জাজনক ব্যাপার ।স্কুল ফাঁকি দিয়েছে বলে কথা ! সেই সাধ পূর্ণ হয়ে গেছিল সেদিনই, কানে ধরেছিলাম, আর জীবনে আমি স্কুল ফাঁকি দেব না ।মিথ্যে হজম করা খুব দুস্কর ব্যাপার, ঐদিন আমি বুঝেছিলাম ।

রোজ সন্ধ্যার পর আবার জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে পড়া । কার আওয়াজ কতদূর পৌঁছাতে পারে, এক ও ধরনের প্রতিযোগিতা ই ছিল,। বিদ্যুৎ ছিলনা তখন আমাদের গ্রামে হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করতে হত । কি পড়াশোনা করতাম তা আসল ব্যাপার ছিল না । কে কত জোরে পড়ে সেটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য । কারণ ঘরের বড়দের আদেশ ছিল, পড়াশোনা মুখ খুলেই করতে হবে । আর সেটা এক ধরনের খেলা ই ছিল তখন আমাদের । এখন সত্যি সেই ছোট বেলা কে খুব মিস করি । আবার যদি আসতো সেদিন ফিরে ।সেই পেয়ারা গাছের তলায়, সেই কুল পেড়ে খাওয়া।

ছোটবেলা উপোস করতেও খুব ভালবাসতাম ।কারণ তো শুধু একটাই ছিল ।উপোস করলে মা খিচুড়ি সবার আগে আমাকেই দেবে ।খিচুড়ি খেতে যে ভীষণ ভালবাসতাম । সারাদিন উপোস করে বসে থাকতাম ।একদিন কি হয়েছিল, লক্ষ্মী পুজোর সকাল ছিল । উপোস করলে মা বলতো, কাজ করতে হয়, তো আমিও কাজে লেগে পড়লাম, সেই লক্ষ্মী পুজোর সকাল ছিল, উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিলাম । ও’মা ! হঠাৎ অনেকগুলো বানর এসে ছুটোছুটি শুরু করল । আমিও কম ছিলাম না, আমিও লেগে পরলাম পাথর ছুড়ে ওদেরকে বাগে আনতে এবং আমার জয় ও হলো । সবগুলো বানর পালিয়ে গেল ভয়ে। মনে মনে তখন নিজেকে বীরের আখ্যা দিয়ে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ালাম। যাক বাবা, এবার শান্তিতে উঠোনটা ঝাড়ু দিতে পারব । একটু পর দেখি একটা বিশাল আকারের বানর এসে আমার পায়ে ক’টা থাপ্পড় মেরে চলে গেল । আচর দেয়নি, তবে কি নরম তুলতুলে হাত বানরের। সেই থেকে আর একটা শিক্ষাও হলো অন্যায় দেখলে পশুরাও প্রতিবাদ করে। তারপর থেকে আমি কোনোদিন কোনো পশু বা পাখীকে অকারন বিরক্ত করি না। আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় নানা রংএর সেই শৈশবে।
‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না’।

Continue Reading

Trending